জুলাই অভ্যুত্থানের পর মামলা, গ্রেপ্তার, অবসর ও ওএসডির চাপে পুলিশ বাহিনী
ঢাকা, ৯ আগস্ট ২০২৬: জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর
অভিযোগে বাংলাদেশ পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন গ্রেপ্তার এবং ৫৭ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। পাশাপাশি ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং ওএসডি ও বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে আরও ১৪২ জনকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ–অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
পরে ৮০ জন ফিরে এলেও ৫৭ জন এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি।
পলাতকদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার সদস্য রয়েছেন।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে বরখাস্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর ২৫ বছরের বেশি চাকরির বয়স যাঁদের, তাঁদের সরাসরি চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও গ্রেপ্তার
গ্রেপ্তার হওয়া ৬৮ কর্মকর্তার মধ্যে সাবেক আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং বিভিন্ন থানার সাবেক ওসি রয়েছেন। কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক
অতিরিক্ত আইজিপি ইকবাল বাহার, গাজীপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে আছেন।
বাধ্যতামূলক অবসর ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
গণ–অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
সর্বশেষ ২৩ জুলাই আরও ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে ৮২ জনকে ওএসডি এবং মোট ১৪২ জনকে বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পলায়নের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩২ জন পুলিশ সুপার, ২৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১৭ জন এএসপি রয়েছেন।
‘ঘটনাস্থলে ছিলাম না, তবুও আসামি’
শাস্তির আওতায় আসা একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই তাঁদের মামলার আসামি করা হয়েছে।
কারও নাম ডিউটি রোস্টারে ছিল না, কেউ অন্য ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন, আবার কেউ ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন না—তবুও তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়েছে।
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা দাবি করেন, ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ওই দিন সেখানে তাঁর কোনো ডিউটি ছিল না এবং তিনি তখন পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন।
পলাতকদের তালিকায় আলোচিত নাম
পলাতক ৫৭ সদস্যের মধ্যে সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, সাবেক
অতিরিক্ত কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও এস এম মেহেদী হাসান এবং অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদারের নাম রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে বিরোধী দল দমন, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং বিচারের আশঙ্কায় তাঁরা কর্মস্থলে ফেরেননি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও রয়েছে
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা দণ্ডিত হয়েছেন।
সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দুটি মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ার পর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পান।
আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক এসআই আবদুল মালেক ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদারকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব মামলায় পুলিশ সদস্যদের কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে।
অভিজ্ঞ কর্মকর্তার সংকটের আশঙ্কা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মামলা, গ্রেপ্তার, অবসর ও ওএসডির কারণে বাহিনীর অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখন দায়িত্বের বাইরে।
এতে মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, যারা আইন ভেঙে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দোষ পুলিশ সদস্য যেন শাস্তি, পদোন্নতি বঞ্চনা বা চাকরিচ্যুতির শিকার না।
ডেস্ক / ইনসাফ নিউজ

























আপনার মতামত লিখুন :